
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইং জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাস্তবতা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান-এই তিন পার্বত্য জেলায় ভোটার নিরাপত্তা, ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের অবাধ ও নিরাপদ ভোটাধিকার। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো-পার্বত্য অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার আজও ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে পৌঁছাতে পারবে কি না, সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে পাচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তা কোনো সাময়িক আতঙ্ক নয়; এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তাজনিত সংকটের ফল।
নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘ ছায়া:
পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর অঞ্চল। এখানে কিছু সশস্ত্র ও সংবিধানবিরোধী গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি একটি বাস্তব সত্য। এসব গোষ্ঠী বাংলাদেশের সংবিধান, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে অগ্রাহ্য করে কখনও প্রকাশ্যে, কখনও পরোক্ষভাবে বিচ্ছিন্নতা কিংবা আলাদা শাসনব্যবস্থার দাবি তোলে। এর ফলাফল হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থায়ী ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
এই ভয় শুধু দৈনন্দিন জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি ভোট প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। কেউ কেউ কেন্দ্রে পৌঁছেও পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোট না দিয়েই ফিরে আসছেন। এর ফলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে, যা একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
দুর্গম ভোটকেন্দ্র: বাস্তবতার কঠিন দেয়াল
পার্বত্য অঞ্চলের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভোটকেন্দ্রগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র পাহাড়ি, বনাঞ্চলঘেরা ও অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। কেন্দ্রে পৌঁছাতে ভোটারদের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রায়শই অপ্রতুল।
বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য এই যাত্রা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। ভোটকেন্দ্র যদি এমন স্থানে অবস্থিত হয়, যেখানে পৌঁছানোই একটি ভয়ের বিষয়, তবে সেই ভোটাধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে-এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
ভোটকেন্দ্র স্থানান্তর: সময়ের দাবি
এই প্রেক্ষাপটে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলো জনবহুল, নিরাপদ ও সহজগম্য স্থানে স্থানান্তরের বিষয়টি এখন আর কেবল প্রস্তাব নয়-বরং সময়ের দাবি। এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে একাধিক ইতিবাচক ফলাফল নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রথমত, ভোটাররা নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
তৃতীয়ত, ভোটার উপস্থিতি বাড়বে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে। সর্বোপরি, জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরবে যে রাষ্ট্র তাদের ভোটাধিকার রক্ষায় আন্তরিক।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও জবাবদিহি
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করা-এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।
যদি আগাম সতর্কবার্তা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় এবং এর ফলে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বা ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তবে সেই দায়ভার এড়ানোর সুযোগ নেই। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি হবে একটি সাংবিধানিক দায়িত্বে অবহেলার নজির।
গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোটার নিরাপত্তার প্রশ্নটি কোনো বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি অঞ্চলের জনগণ যদি নিরাপদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারে, তবে সেই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে—যার প্রভাব পড়বে পুরো রাষ্ট্রের ওপর।
গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়। পার্বত্য অঞ্চলের ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
গণমাধ্যমের ভূমিকা:
এই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সংবাদই পারে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। পার্বত্য অঞ্চলের ভোটকেন্দ্রের প্রকৃত অবস্থা, ভোটারদের উদ্বেগ ও নিরাপত্তাজনিত সংকট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা হলে জনসচেতনতা বাড়বে এবং কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
করণীয় এখনই
এই সম্পাদকীয় থেকে স্পষ্টভাবে বলা যায়-ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। দুর্গম ও রিমোট এলাকা থেকে ভোটকেন্দ্র নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে। সশস্ত্র ও সংবিধানবিরোধী তৎপরতার ওপর প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করতে হবে। ভোটারদের মধ্যে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ভোটদানের বিষয়ে আস্থা ও সচেতনতা তৈরি করতে হবে। গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়মিত ও গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ ভোট শুধু ওই অঞ্চলের মানুষের অধিকার নয়-এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ইতিহাস একদিন কঠিন প্রশ্ন তুলবে, যার উত্তর দেওয়া সহজ হবে না।
লেখক:
মুফতী রবিউল ইসলাম শামীম
লেখক | রাষ্ট্রচিন্তক | পার্বত্য গবেষক
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ
(কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি)
প্রতিনিধির নাম 

























