
মোঃ হিমেল হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধি
সংসার, সন্তান ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে ৪৩তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রওশন আরা খান সোমা। অন্যদিকে তাঁর স্বামী আরিফুজ্জামান তুষার পিএসসির নন-ক্যাডার নিয়োগের মাধ্যমে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দুজনের পেশাগত পথ আলাদা হলেও নিজেদের স্বপ্ন পূরণে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ধৈর্য ও অধ্যবসায় তাঁদের সাফল্যের মূল ভিত্তি।
রওশন আরা খান সোমা ও আরিফুজ্জামান তুষার দুজনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তাঁদের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে করোনাকালীন সময়ে ২০২১ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনের পাশাপাশি নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যে দুজনেই নিজ নিজ পথে এগিয়ে যেতে থাকেন।
সোমার বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয় অনেক আগে। এইচএসসিতে ভর্তির সময় একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তার কাছে কাগজপত্র সত্যায়ন করতে গিয়ে প্রথমবারের মতো ক্যাডার হওয়ার বিষয়টি তাঁর মনে আগ্রহ তৈরি করে। সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে স্বপ্নে রূপ নেয়। ২০১৯ সাল থেকে শুরু করেন বিসিএসের প্রস্তুতি।
৪১তম বিসিএস ছিল তাঁর প্রথম বিসিএস পরীক্ষা। শুরু থেকেই মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রিলিমিনারির প্রস্তুতি নেন তিনি। নিয়মিত সংবাদপত্র পড়া ও বই পড়ার দীর্ঘদিনের অভ্যাস তাঁর প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ও বাংলা বিষয়ে নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবই, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মানচিত্র এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক বই অনুসরণ করেন।
ইংরেজির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বেসিক গ্রামার ও ইংরেজি সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের জন্য নবম-দশম শ্রেণির বই ও সহায়ক সিরিজ অনুসরণ করেন। পাশাপাশি অনলাইনে বিভিন্ন নমুনা এমসিকিউ ও মডেল টেস্টে অংশ নিয়ে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করতেন। প্রতিটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শেষবারের মতো রিভিশন দিতেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতেই কাটমার্কের ওপরে নম্বর পাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
তবে প্রস্তুতির পথে তাঁর দুর্বলতাও ছিল। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে শুরুতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাঁকে। ইংরেজির দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় নিয়মিত ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা পড়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা ইংরেজি পত্রিকা পড়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাক্য গঠন, শব্দভান্ডার, অনুবাদ, লেখার দক্ষতা ও ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিংয়ে উন্নতি করেন। তাঁর মতে, ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাসই ইংরেজি প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি করেছে।
গণিতেও দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারেননি তিনি। এতে হতাশ না হয়ে নিজের সক্ষমতা ও সময় বিবেচনায় প্রস্তুতির কৌশল পরিবর্তন করেন। গণিতকে একেবারে বাদ না দিয়ে সীমিত সময় দিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেন।
প্রিলিমিনারি, লিখিত কিংবা ভাইভা—কোনো পর্যায়েই কোচিংয়ে ভর্তি হননি সোমা। নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী সিলেবাস, বিগত বছরের প্রশ্ন ও প্রয়োজনীয় বই অনুসরণ করেই প্রস্তুতি চালিয়ে যান।
৪১তম বিসিএসে ভালো পরীক্ষা দিয়েও লিখিত পরীক্ষার ধাপ অতিক্রম করতে পারেননি তিনি। তবে সেই ব্যর্থতাকে থেমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখেননি। বরং আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য আরও পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ৪৩তম বিসিএসেই প্রথমবারের মতো ভাইভায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি।
ভাইভার সময় তাঁর মেয়ের বয়স ছিল মাত্র সাত মাস। ছোট সন্তান, সংসারের দায়িত্ব এবং বিসিএসের প্রস্তুতি—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। দিনের অধিকাংশ সময় সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকার পর রাত ১০টার পর পড়তে বসতেন। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পড়ার সুযোগ পেতেন। সেই সীমিত সময়কেই কাজে লাগিয়ে প্রস্তুতি এগিয়ে নেন।
ভাইভার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও নিজের মতো করে পরিকল্পনা করেন সোমা। অনলাইনে বিভিন্ন মক ভাইভা ভিডিও দেখার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দ্রুত পুনরালোচনা করেন। সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অনুশীলনের পাশাপাশি নিজের একাডেমিক বিষয়েও ভালোভাবে প্রস্তুতি নেন। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতাও ভাইভায় আত্মবিশ্বাসী হতে তাঁকে সহায়তা করে। তাঁর ভাইভায় একাডেমিক বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রশ্নই বেশি করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
অবশেষে ৪৩তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন রওশন আরা খান সোমা। বর্তমানে তিনি শিক্ষা ক্যাডারের চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর চাকরিতে যোগদানের পর ইতোমধ্যে প্রায় এক বছর নয় মাস পেরিয়ে গেছে।
অন্যদিকে আরিফুজ্জামান তুষারের ক্যারিয়ার গড়ার গল্পও ভিন্ন ধরনের। তিনিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ফুটবল খেলোয়াড়। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ থেকেই তাঁর মনে ক্রীড়া কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়।
সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাস্টার্স শেষ করার পর এক বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (বিপিএড) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন তুষার। পরবর্তীতে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় দুই বছর চাকরি করেন। এরপর ২০১৯ সালে পিএসসির মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।
তুষারের এই নিয়োগ বিসিএস ক্যাডার নিয়োগ নয়; তিনি পিএসসির নন-ক্যাডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অন্যান্য পিএসসি নন-ক্যাডার পদের মতো তাঁকেও মূল বিষয়গুলোর প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। তবে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় খেলাধুলা বিষয়ে আলাদাভাবে ৬০ নম্বরের প্রশ্ন থাকায় এ অংশে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হয়ে
প্রতিনিধির নাম 


















