
নুরুজ্জামান লিটন, জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় অবৈধ ভিটা মাটি কাটা যেন আর গোপন কোনো অপরাধ নয়—বরং প্রশাসনের চোখের সামনেই দিনের আলোয় চলা এক প্রকাশ্য আইনবহির্ভূত ব্যবসা। মথুরাপুর ইউনিয়নের কসবা মৌজায় সরকারি অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে ভিটা মাটি কেটে বিক্রি করা হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রহস্যজনক নীরবতায় এই অপরাধ আজ কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
রাতের আঁধারে শুরু, প্রশাসনের সামনে শেষ
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কসবা গ্রামের আঃ সালাম, রুবেল, জুয়েল ও রাইহান নামের কয়েকজন ব্যক্তি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে নিয়মিত অবৈধভাবে ভিটা মাটি কেটে আসছেন। প্রতিদিন ভোররাত আনুমানিক ২টা থেকে সকাল ৯–১০টা পর্যন্ত কাকড়া ট্রাকে করে এসব মাটি বিভিন্ন ইটভাটা ও নির্মাণ প্রকল্পে সরবরাহ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম চললেও আশ্চর্যজনকভাবে কখনোই কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
হাতেনাতে ধরা—তবুও শাস্তি নেই
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬। সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে বদলগাছী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ পলাশ উদ্দীন নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অবৈধ মাটি বোঝাই একটি কাকড়া ট্রাক আটক করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রাকটি তখন সরাসরি ভিটা মাটি বহন করছিল।
কিন্তু এখানেই জন্ম নেয় গুরুতর প্রশ্ন।
অপরাধ হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও কোনো মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়নি, আরোপ করা হয়নি জরিমানা, দায়ের হয়নি কোনো মামলা। বরং কিছুক্ষণ পর অজ্ঞাত কারণে ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়া হয়। এটি কি আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা, নাকি প্রশাসনিক সদিচ্ছার ঘাটতি?
ভূমি আইন কি কেবল কাগজে-কলমেই?
প্রচলিত ভূমি ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে—সরকারি অনুমতি ছাড়া ভিটা বা কৃষিজমির মাটি কাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেখানে প্রশাসনের সরাসরি উপস্থিতিতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া মানে আইনকে প্রকাশ্যেই উপেক্ষা করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ঘটনা অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের জন্য এক ভয়ংকর বার্তা বহন করে—“ধরা পড়লেও শাস্তি নেই”। ফলে একদিকে পরিবেশ ও কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা।
প্রশাসনের নীরবতাই কি অপরাধের শক্তি?
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর কসবা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি সহকারী কমিশনারের উপস্থিতিতেই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিচার না হয়, তবে মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের দায় আসলে কার?
এই বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ পলাশ উদ্দীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর এই নীরবতাও নতুন করে সন্দেহ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের ধারণা, বদলগাছীতে অবৈধ মাটি কাটার পেছনে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। প্রশাসনিক ছত্রছায়া ছাড়া দিনের পর দিন এভাবে মাটি লুট সম্ভব নয় বলেই তাদের দাবি।
তারা অবিলম্বে—
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত
দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা
অবৈধ মাটি কাটার সিন্ডিকেট চিহ্নিত ও ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
শেষ প্রশ্ন থেকেই যায়
আইনের চোখে কি সত্যিই সবাই সমান?
নাকি প্রভাবশালীদের জন্য রয়েছে আলাদা নিয়ম?
বদলগাছীর কসবা মৌজার এই ঘটনা আজ শুধু একটি ট্রাক ছেড়ে দেওয়ার গল্প নয়—এটি রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার এক নগ্ন চিত্র, যার জবাব এখন প্রশাসনকেই দিতে হবে।
প্রতিনিধির নাম 

























