
নিজস্ব প্রতিনিধি:কক্সবাজার
কক্সবাজারের চকরিয়া ও লামা সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া, বিশেষ করে পাগলির ছড়ার শেষ প্রান্তের পূর্ব পাশ, রংমহলের সোজা পূর্ব দিক, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ও বগাছড়ি পাহাড়ের ছড়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে ব্যাপক বালি উত্তোলন। সংরক্ষিত বনভূমিতে ড্রেজার মিশিন লাগিয়ে বালি উত্তোলনের ফলে পাহাড় এখন কৃত্রিম ছড়ায় পরিনত হয়েছে। যার সুযোগে বনবিভাগের দাবি বালি উত্তোলনের স্থানটি ১নং ডিসি খাস খতিয়ানভুক্ত অপরদিকে উপজেলা প্রশাসনও বনবিভাগের রেকর্ডীয় ভূমি হিসেবে এড়িয়ে যায়। বননিভাগ আর উপজেলা প্রশাসনের রশি টানাটানির ফলে বিনষ্ট হচ্ছে বনভূমি, চরম বিপর্যয় ও হুমকির মুখে পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েকবছর ধরে প্রভাবশালী চক্রটি সরকারি নিয়ম-নীতি অমান্য করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এসব এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছে এবং প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। প্রতিমাসের হিসেবে অবৈধ বালি বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় কোটি কোটি টাকায়। বনবিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে পরিবেশ বিধ্বংসী এই মহা কর্মজজ্ঞ। ভারী যানবাহনের চলাচলে প্রতিদিন গ্রামের সড়কগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধুলাবালিতে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন আশপাশের গ্রামের মানুষ। বালুবাহী ট্রাকের গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
প্রকাশ্যে পাহাড়ি ছড়া থেকে বালি উত্তোলন করে ডুলাহাজারা বাজারের প্বার্শবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভুট্টোর নেতৃত্বে বালির স্তূপ করলেও তা চোখে পড়ে না বিট কর্মকর্তা শাহারিয়ার আলমের। বিট কর্মকর্তা জানান তার আওতাধীন কোন বনভূমিতে এক বিন্দু পরিমানও বালি উত্তোলন ও স্তূপ করা হচ্ছে না।
ফাসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফোনে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে অফিসে চায়ের দাওয়াত দিয়েছেন।
কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগীয় কর্মকর্তা জানান, বনবিভাগের সার্ভেয়ারের মাধ্যমে সার্ভে করে পাগলিরবিল এরিয়ার বালি উত্তোলনের স্থানসমূহ তার ডিভিশনের আওতাধীন নই। এবং স্থানসমূহ লামা বনবিভাগের আওতাভুক্ত।
অপরদিকে লামা বনবিভাগের লামা রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, পাগলিরবিলের ছড়াগুলো কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের আওতাধীন ফাঁসিয়াখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের। তবে কিছু খাস খতিয়ানভুক্ত বনভূমিও রয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী কমিশনার (ভূমি) জানান, কয়েকদিন আগেও ডুলাহাজারা পাগলির বিলে একটি ট্রাক সহ বালুর স্তুপ জব্দ করে নিলামে দিয়েছি। তবে আবারো শোনা যাচ্ছে তারা লামা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বালু এনে ডুলহাজারায় জমা করতেছে। শীঘ্রই অভিযান চালানো হবে বলেও জানান তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাহাড়ি বালি উত্তোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চকরিয়ার ডুলাহাজার রংমহল এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ আহমদের ছেলে আওয়ামীলীগ নেতা জয়নাল আবেদীন ভুট্টো। তার নেতৃত্বে একটি সংগঠিত চক্র বনবিভাগ, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পাহাড়ি ছড়ার বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রকাশ্যে বালি উত্তোলন করছে। ২৪’র আগষ্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর একই এলাকার আনিস, জাহাঙ্গীর ও নোমানের নেতৃত্বাধীন আরও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বালি উত্তোলন করছে প্রতিনিয়ত। এসব বালি শতাধিক ট্রাক ও ডাম্পার যোগে ডুলাহাজারার বাজারের প্বার্শবর্তী বিভিন্ন জায়গায় স্তূপ করে রাখে। প্রশাসন ও বনবিভাগের নাকের ডগায় বালির স্তূপ করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করে ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন চক্রটি। আরো জানা যায়, ডাম্পার প্রতি ৫০ টাকা মাসোহারা চলে যায় ডুলাহাজারা বনবিট ও ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে। যার একটি অংশ কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগীয় কর্মকর্তার কাছেও পৌঁছে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বনকর্তা বলেন, ভুট্টো সাহেব বনবিভাগ চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী ঠিকাদার হওয়ায় বন সংরক্ষকের সাথে ভালো সম্পর্ক। সে সুবাদে বনবিভাগ চট্টগ্রাম অঞ্চলের অভ্যন্তরীন প্রশাসনিক মেকানিজম হয় ভুট্টোর মনমতোন। সেকারণে কক্সবাজার উত্তর-দক্ষিণ বনবিভাগের কর্মকর্তারা ভুট্টোকে ভয় পাই।
জয়নাল আবেদীন ভুট্টো অতীতে বনবিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বালি উত্তোলন করলেও এখন শুধু নিলামের বালি সরবরাহ করে বলে মুঠোফোনে জানান।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডুলাহাজারা বাজার হয়ে রংমহল, পাগলির বিল, হারগাজা রোড হয়ে শতাধিক পাহাড়ি বালিভর্তী ডাম্পার ও ট্রাক চলাচল করে। আনুমানিক হিসেবে দৈনিক ট্রিপের পরিমান ১ হাজার ! ট্রিপ প্রতি ৫০ টাকার হিসেবে দৈনিক ৫০ হাজার টাকা মাসোহারা যায় বনবিভাগে। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক মাসোহারা পৌছানো হয় ভুট্টোর নেতৃত্বে। তবে কিছুদিন আগে ডুলাহাজারা বাজারের কাছাকাছি কয়েকটি বালির স্তূপ জব্দ করে নিলাম দিয়েছিলো চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু স্থানীয়রা জানান অভিযানটি এক প্রকার লোকদেখানো ছিলো। বনবিভাগও প্রায় সময়ে দেখা যায় নিয়ম রক্ষার টহল অভিযান করে।
একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। কারণ এই চক্রটির রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান, আর তাদের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মহলের আশীর্বাদ। চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন ও লামা উপজেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিয়মিত মাসোহারা গ্রহণ করে এই অবৈধ কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এসব পরিবেশ বিধ্বংসী অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু অজানা কারণে তারা দেখেও, না দেখার ভান করে থাকে।
পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ি ছড়া ও নদীখাল থেকে বালু উত্তোলন করলে তিন ধরনের বড় ক্ষতি হয়।
পাহাড় ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, যা বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও রাস্তাঘাটকে বিপন্ন করে। জলধারার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত, ফলে শুকিয়ে যায় ছড়া, কমে যায় মিঠাপানির মজুত। বনাঞ্চল ও প্রাণবৈচিত্র্যের ধ্বংস, কারণ ছড়া ও পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে প্রাণীর আবাসস্থল ভেঙে পড়ে।
প্রতিনিধির নাম 

























