
অধ্যাপক ড. রকিবুল হাসান বাংলা সাহিত্যের এমন এক নাম, যিনি একইসঙ্গে কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাংবাদিক। তাঁর জন্ম ১৯৬৮ সালের ৩১ মে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার কয়া গ্রামে। বাবার নাম মোহাম্মদ উকিল উদ্দিন শেখ ও মাতা পরীজান নেছা। গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তাঁর চিন্তা ও সাহিত্যবোধের ভিত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষাজীবনে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে সাহিত্যচর্চা ও গবেষণাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেন। বর্তমানে তিনি সাপ্তাহিক অর্থবিত্ত ও সাহিত্যপত্রিকা গৈরিক-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রকিবুল হাসানের সাহিত্যভুবন বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। তাঁর প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী রচনায় ইতিহাস, রাজনীতি, লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যতত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ “বিপ্লবী বাঘা যতীন”, “পথের কথা”, “কয়ায় রবীন্দ্রনাথ” ও “বাঘা যতীন এবং প্রাজ্ঞজন”। এসব রচনায় তিনি ইতিহাসের ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যচিন্তাকে কেবল তথ্য হিসেবে উপস্থাপন না করে তার অন্তর্গত চেতনা ও সময়-প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। বাঘা যতীনকে তিনি উপস্থাপন করেছেন জাতীয় চেতনা ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে, যেখানে ইতিহাস ও দেশপ্রেম একসূত্রে গ্রথিত হয়েছে।
তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি, সমাজচেতনা ও অস্তিত্বের সংকট একসঙ্গে উপস্থিত। “দুঃখময়ী শ্যামবর্ণ রাত” কাব্যগ্রন্থে প্রেম ও বিচ্ছেদের বিষণ্নতা একটি গভীর অন্তর্লীন ভাষা পেয়েছে। “অনিয়ম চুম্বনের সিঁড়ি ধরে” গ্রন্থে প্রেমকে তিনি প্রচলিত রোমান্টিকতার বাইরে নিয়ে গিয়ে এক দার্শনিক ও জটিল মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। “এক ধরনের অহংকার” কাব্যগ্রন্থে আত্মসত্তা, সম্পর্ক ও সমাজচেতনার টানাপড়েন এক ভিন্নমাত্রিক কাব্যভাষা তৈরি করেছে।
রকিবুল হাসানের কথাসাহিত্যে সমাজের বাস্তব চিত্র, রাজনৈতিক অবক্ষয় ও মানুষের অন্তর্জগতের জটিলতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। “জীবন দিয়ে ভালোবাসি”, “ভাঙন”, “ছায়াবন্দি”, “এ কি তৃষ্ণা এ কি দাহ” এবং “নবীরন” তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এসব রচনায় তিনি মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পাশাপাশি সামাজিক কাঠামোর ভাঙন, শ্রেণী-বৈষম্য ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর চরিত্রগুলো কেবল সাহিত্যিক নির্মাণ নয়, বরং বাস্তব জীবনের প্রতিনিধিত্বকারী সত্তা হিসেবে উপস্থিত।
সম্পাদনা ও সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থেও তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ। “নবতরঙ্গের ধ্বনিবন্ধ”, “আমার সোনার বাংলা কই”, “কত কবিতা শুনলাম কিন্তু” এবং “ইন্টারভিউ” গ্রন্থে তিনি সমকালীন সাহিত্যচিন্তা, কবি-সাহিত্যিকদের অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক প্রবাহকে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।
সমগ্র সাহিত্যকর্মে অধ্যাপক ড. রকিবুল হাসান একজন বহুমাত্রিক চিন্তাশীল লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর রচনায় সাহিত্য কেবল শিল্প নয়, বরং ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের জীবনকে বোঝার এক গভীর অনুসন্ধান। এই কারণে তাঁকে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে একজন সব্যসাচী লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন চিন্তাসূত্র সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা সাহিত্য পদক, স্যার সলিমুল্লাহ পদক, দি সান সম্মাননা এবং চাইল্ড হেভেন সম্মাননা। তিনি বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য এবং কুষ্টিয়া জেলা সমিতি (ঢাকা)-এর আজীবন সদস্য। এছাড়া, তিনি কুষ্টিয়া সাহিত্য একাডেমির নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
আজ তাঁর জন্মদিনে বাংলা সাহিত্যাঙ্গন তাঁকে জানায় শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন দীর্ঘ হোক। তাঁর সৃষ্টি আগামী প্রজন্মের সাহিত্যচিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করুক এই প্রত্যাশা।
প্রতিনিধির নাম 



















