
খান আরিফুজ্জামান(নয়ন),
ডুমুরিয়া(খুলনা),প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলা বর্তমানে দেশের গলদা চিংড়ি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। উপজেলার ১৪ টি ইউনিযনের প্রায় ২৩,০৭৬ জন মৎস্যচাষির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ উপজেলায় মাছ ও চিংড়ির বার্ষিক উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ১৬,২২০ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে গলদা চিংড়ির উৎপাদনই সর্বাধিক, যা দেশের মোট উৎপাদনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
এ অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে উপজেলা মৎস্য দপ্তরের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষ পদ্ধতি। বর্তমান সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান-এর নেতৃত্বে দপ্তরটির কার্যক্রম নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আগে যেখানে চাষিরা সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করতেন, সেখানে এখন তারা আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। মৎস্য অফিসের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পানি ও মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, রোগব্যাধির পূর্বাভাস, চিংড়ির খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং ঘেরের গঠন প্রণালীতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
শোভনা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি আবু বকর বলেন, “আমরা আগে সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করতাম। সঠিক পদ্ধতি জানতাম না। রিগান স্যার আমাদের আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ঘের কেমন হবে, কীভাবে খাবার দিতে হবে—সবকিছু হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। এখন আমি ও আমার গ্রুপের ২৫ জন চাষি আগে যেখানে যা উৎপাদন করতাম, এখন আশা করছি তা দ্বিগুণ হবে।”
রুদাঘরা ইউনিয়নের চাষি মঞ্জরুল ইসলাম বলেন, “আমার ঘেরের গভীরতা ২.৫ ফুটের মতো ছিল। জানতাম না যে ৪-৬ ফুট গভীরতা চিংড়ির জন্য আদর্শ। রিগান স্যারের পরামর্শে ঘেরের গভীরতা বাড়িয়েছি। এখন চিংড়ি দ্রুত বড় হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আগে মৎস্য অফিসে যেতাম না। ভাবতাম, সরকারি অফিস মানেই হয়রানি। এখন অফিসে গেলে সবাই ভালো ব্যবহার করে। হাসিমুখে বসতে বলে, দ্রুত সেবা দেয়। এটা সত্যিই আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।”
মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি হাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা চাষিরা আগে ভাবতাম অফিসে যাওয়া মানেই সময়ের অপচয়। কিন্তু এখন মৎস্য অফিসকে ফোন দিলেই একজন অফিসার বাইকে করে ঘেরে চলে আসে। পানি পরীক্ষা করে, মাটি পরীক্ষা করে, কী করতে হবে সে পরামর্শও দেয়। পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করলে ফলও মিলছে। আমরা চাই, এই সেবা যেন নিয়মিত অব্যাহত থাকে।”
এ বিষয়ে কথা হয় ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জনাব সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান এর সাথে। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি চাষির দোরগোড়ায় আধুনিক চাষ পদ্ধতি পৌঁছে দেওয়া। আমরা চাই একজন চাষিও যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। তাই ঘরে বসে নয়, সরাসরি মাঠে গিয়ে পানি-মাটি পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। চাষিদের উৎপাদন বাড়িয়ে দেশীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।”
তিনি আরও জানান, খুলনা বিভাগের সম্মানিত ডাইরেক্টর জনাব মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন ও জেলা মৎস্য অফিসার, খুলনা জনাব মোঃ বদরুজ্জামান স্যারের পরামর্শে চাষিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালা, নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, পরামর্শ সেবা জোরদারকরণ এবং মাঠ পর্যায়ে উঠান বৈঠক পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে চাষিরা সচেতন হচ্ছেন, সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষে মনোযোগী হচ্ছেন।
ডুমুরিয়ার চিংড়ি এখন শুধু খুলনার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার উৎপাদিত গলদা চিংড়ি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ডুমুরিয়া হবে দেশের চিংড়ি রপ্তানির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে সরকারিভাবে চাষিদের জন্য প্রণোদনা, সহজ ঋণ এবং বিপণনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকলে এই খাত আরও সমৃদ্ধ হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাষিরা মনে করেন, মৎস্য অফিসের আন্তরিকতা ও সেবা যদি এভাবে অব্যাহত থাকে, তাহলে অচিরেই ডুমুরিয়া হবে দেশের অনুকরণীয় একটি উপজেলা।
প্রতিনিধির নাম 



















