ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ বাংলা

অবৈধ বিপুল অর্থের মালিক টিপু চেয়ারম্যান হত্যা মামলার আসামি হয়েও আছেন বহাল তবিয়তে

আরিফুর রহমান, মাদারীপুর :

ভোট ডাকাতি, টাকা পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, খাল দখলসহ অবৈধ বিপুল পরিমান অর্থের মালিক হয়েছেন টিপু চেয়ারম্যান ও তার তিন ভাই। মন্ত্রী, আইজিপি ও বড় বড় পুলিশ কর্তাদের টাকা পাচার করার অভিযোগ রয়েছে তাদের ৪ ভাইর বিরুদ্ধে। একাধিক মন্ত্রী, এমপিসহ পুলিশের কর্তাদের দাপটে মাফিয়া হয়ে উঠেছিলেন টিপু ও জুয়েল। আওয়ামী সরকারের পতনের পর জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতাদের ছত্রছায়ায় আবারও নিজেদের ক্ষমতা পূণঃউদ্ধারের চেষ্টা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। টিপু চেয়ারম্যানের নামে মাদারীপুর ও ঢাকায় হত্যাসহ দুটি মামলার থাকলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছে না। আওয়ামী সরকারের পতনের পর এলাকাবাসী স্বস্তির নিঃশ^াস ছাড়লেও বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের সাথে তাদের নতুন সখ্যতায় তারা আতংকিত।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মান্নান মাতুব্বরের ৪ ছেলে টিপু সুলতান মাতুব্বর, লিটু মাতুব্বর, কামরুল হাসান জুয়েল ও সোহেল মাতুব্বর। চার ভাইই দীর্ঘদিন সৌদিতে থাকতেন। আওয়ামীলীগ শাসনামলে কিছু মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তাদের সাথে সখ্য গড়ে তোলেন চার ভাই। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাদের। আওয়ামীলীগের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাদেরসহ পুলিশের বড় বড় কর্তাদের টাকা পাচারের মূল মাধ্যম বনে যায় এই টিপু ও তার ভাই জুয়েল। বাকী দুই ভাই সৌদিতে থেকে সহযোগীতা করে অন্য দুই ভাইকে। এভাবে বিপুল টাকার মালিক বনে যান চার ভাই। প্রবাসে থাকায় এলাকা মানুষ তেমন না চিনলেও বড় ভাই টিপু সুলতান দেশে এসে স্থানীয় এমপি ও সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ টাকা আর ভোট ডাকাতি করে হয়ে যায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। জেলা ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ করেন এই চার ভাই। বাড়ির সামনের খালটি ভরাট করে দখলের অভিযোগ আছে এই চেয়ারম্যান টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে। এলাকায় তাদের ক্ষমতার জানান দিতে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুনকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। বড় ভাই টিপু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার পর অপর ভাই জুয়েলের নজর পড়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ারের দিকে। তাই পোষ্টার করে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার জানান দেয় জুয়েল। এই জুয়েল নারী সাপ্লাই দিয়ে বড় বড় নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করতেন বলে অভিযোগ জুয়েলের দ্বিতীয় স্ত্রীর। আওয়ামী সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে টাকা ও লোক দেয়ারও অভিযোগ আছে টিপু ও জুয়েলের বিরুদ্ধে। বর্তমানে একইভাবে বিএনপি নেতাদের সুনজর পাওয়ার চেষ্টা করছে ৪ ভাই। এজন্য টাকা ও নারীকেই অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জুয়েলের দ্বিতীয় স্ত্রী রোমানা স্বর্ণা জানান, জুয়েল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ বেশ কিছু মন্ত্রী ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করতো। এছাড়া নারীদের দিয়ে মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করতো। যা জুয়েলই তাকে জানিয়েছে। এদের ব্যবহার করে ও তাদের টাকা পাচার করে কোটি কোটি টাকার মালিকসহ বহু সম্পত্তির মালিক হয়েছে জুয়েলের পরিবার। মিরপুর পল্লবী, গাজীপুর, আফতাব নগর, শিবচর ও রাজৈরে প্রচুর সম্পতি আছে তাদের।
টিপু, জুয়েলের ভয়ে এখনও এলাকার কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, টিপু চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা কারো নেই। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে মারধোর করা হয়, না হলে মিথ্যা মামলা দিয়ে সর্বশান্ত করে দেয়। টিপুর চেয়েও টিপুর ভাই জুয়েল ভয়ংকর। কথায় কথায় গালিগালাজ করা এবং মারধোর করা তার নিত্য স্বভাব। আগে আওয়ামীলীগের নেতাদের জোরে ক্ষমতা দেখাতো। এখন বিএনপির লোকজনও তাদের কথা বলে। তাই তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে সাহস পায়না।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাহান্দার আলী জাহান বলেন, যারা আওয়ামীলীগ আমলে লুটপাট করে এবং টাকা পাচার করে দেশকে ধ্বংসের মূখে নিয়ে গেছে এবং যারা বিএনপির ক্ষতি করেছে ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাদের সাথে আমাদের নেতা কর্মীদের কোন সম্পর্ক হতে পারে না। আমাদের নেতা তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনা আছে যারা এদের পূণর্বাসন করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাদারীপুর দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক আতিক রহমান বলেন, যদি কারো বিরুদ্ধে সুনিদৃষ্ট কোন অভিযোগ থাকে বা কোন স্বীকৃত গণমাধ্যমে কারো বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার হয় তাহলে আমরা যাচাই বাছাই করে একটি রিপোর্ট তৈরি করে প্রধান কার্যালয় পাঠাই। প্রধান কার্যালয় নির্দেশনা দিলে আমরা সে বিষয়ে কাজ করি।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান জানান, টিপুর বিরুদ্ধে দুটি মামলা আছে। আমরা চেষ্টা করছি টিপুকে গ্রেফতার করতে। এছাড়া টিপু বা তার পরিবার আর কোন অপরাধের সাথে জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বি.দ্র : ছবিতে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ডান পাশে সাদা পাঞ্জাবি পড়া লোকটিই চেয়ারম্যান টিপু সুলতান ও বাম পাশে সার্ট ইন করা লোকটি কামরুল হাসান জুয়েল।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ইতালিতে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতির বার্ষিক আনন্দ ভ্রমণ: প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রবাসীদের দিনভর আনন্দ-উচ্ছ্বাস

অবৈধ বিপুল অর্থের মালিক টিপু চেয়ারম্যান হত্যা মামলার আসামি হয়েও আছেন বহাল তবিয়তে

০২:৩৩:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৫

আরিফুর রহমান, মাদারীপুর :

ভোট ডাকাতি, টাকা পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, খাল দখলসহ অবৈধ বিপুল পরিমান অর্থের মালিক হয়েছেন টিপু চেয়ারম্যান ও তার তিন ভাই। মন্ত্রী, আইজিপি ও বড় বড় পুলিশ কর্তাদের টাকা পাচার করার অভিযোগ রয়েছে তাদের ৪ ভাইর বিরুদ্ধে। একাধিক মন্ত্রী, এমপিসহ পুলিশের কর্তাদের দাপটে মাফিয়া হয়ে উঠেছিলেন টিপু ও জুয়েল। আওয়ামী সরকারের পতনের পর জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতাদের ছত্রছায়ায় আবারও নিজেদের ক্ষমতা পূণঃউদ্ধারের চেষ্টা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। টিপু চেয়ারম্যানের নামে মাদারীপুর ও ঢাকায় হত্যাসহ দুটি মামলার থাকলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছে না। আওয়ামী সরকারের পতনের পর এলাকাবাসী স্বস্তির নিঃশ^াস ছাড়লেও বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের সাথে তাদের নতুন সখ্যতায় তারা আতংকিত।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মান্নান মাতুব্বরের ৪ ছেলে টিপু সুলতান মাতুব্বর, লিটু মাতুব্বর, কামরুল হাসান জুয়েল ও সোহেল মাতুব্বর। চার ভাইই দীর্ঘদিন সৌদিতে থাকতেন। আওয়ামীলীগ শাসনামলে কিছু মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তাদের সাথে সখ্য গড়ে তোলেন চার ভাই। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাদের। আওয়ামীলীগের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাদেরসহ পুলিশের বড় বড় কর্তাদের টাকা পাচারের মূল মাধ্যম বনে যায় এই টিপু ও তার ভাই জুয়েল। বাকী দুই ভাই সৌদিতে থেকে সহযোগীতা করে অন্য দুই ভাইকে। এভাবে বিপুল টাকার মালিক বনে যান চার ভাই। প্রবাসে থাকায় এলাকা মানুষ তেমন না চিনলেও বড় ভাই টিপু সুলতান দেশে এসে স্থানীয় এমপি ও সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ টাকা আর ভোট ডাকাতি করে হয়ে যায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। জেলা ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ করেন এই চার ভাই। বাড়ির সামনের খালটি ভরাট করে দখলের অভিযোগ আছে এই চেয়ারম্যান টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে। এলাকায় তাদের ক্ষমতার জানান দিতে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুনকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। বড় ভাই টিপু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার পর অপর ভাই জুয়েলের নজর পড়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ারের দিকে। তাই পোষ্টার করে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার জানান দেয় জুয়েল। এই জুয়েল নারী সাপ্লাই দিয়ে বড় বড় নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করতেন বলে অভিযোগ জুয়েলের দ্বিতীয় স্ত্রীর। আওয়ামী সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে টাকা ও লোক দেয়ারও অভিযোগ আছে টিপু ও জুয়েলের বিরুদ্ধে। বর্তমানে একইভাবে বিএনপি নেতাদের সুনজর পাওয়ার চেষ্টা করছে ৪ ভাই। এজন্য টাকা ও নারীকেই অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জুয়েলের দ্বিতীয় স্ত্রী রোমানা স্বর্ণা জানান, জুয়েল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ বেশ কিছু মন্ত্রী ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করতো। এছাড়া নারীদের দিয়ে মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করতো। যা জুয়েলই তাকে জানিয়েছে। এদের ব্যবহার করে ও তাদের টাকা পাচার করে কোটি কোটি টাকার মালিকসহ বহু সম্পত্তির মালিক হয়েছে জুয়েলের পরিবার। মিরপুর পল্লবী, গাজীপুর, আফতাব নগর, শিবচর ও রাজৈরে প্রচুর সম্পতি আছে তাদের।
টিপু, জুয়েলের ভয়ে এখনও এলাকার কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, টিপু চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা কারো নেই। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে মারধোর করা হয়, না হলে মিথ্যা মামলা দিয়ে সর্বশান্ত করে দেয়। টিপুর চেয়েও টিপুর ভাই জুয়েল ভয়ংকর। কথায় কথায় গালিগালাজ করা এবং মারধোর করা তার নিত্য স্বভাব। আগে আওয়ামীলীগের নেতাদের জোরে ক্ষমতা দেখাতো। এখন বিএনপির লোকজনও তাদের কথা বলে। তাই তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে সাহস পায়না।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাহান্দার আলী জাহান বলেন, যারা আওয়ামীলীগ আমলে লুটপাট করে এবং টাকা পাচার করে দেশকে ধ্বংসের মূখে নিয়ে গেছে এবং যারা বিএনপির ক্ষতি করেছে ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাদের সাথে আমাদের নেতা কর্মীদের কোন সম্পর্ক হতে পারে না। আমাদের নেতা তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনা আছে যারা এদের পূণর্বাসন করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাদারীপুর দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক আতিক রহমান বলেন, যদি কারো বিরুদ্ধে সুনিদৃষ্ট কোন অভিযোগ থাকে বা কোন স্বীকৃত গণমাধ্যমে কারো বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার হয় তাহলে আমরা যাচাই বাছাই করে একটি রিপোর্ট তৈরি করে প্রধান কার্যালয় পাঠাই। প্রধান কার্যালয় নির্দেশনা দিলে আমরা সে বিষয়ে কাজ করি।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান জানান, টিপুর বিরুদ্ধে দুটি মামলা আছে। আমরা চেষ্টা করছি টিপুকে গ্রেফতার করতে। এছাড়া টিপু বা তার পরিবার আর কোন অপরাধের সাথে জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বি.দ্র : ছবিতে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ডান পাশে সাদা পাঞ্জাবি পড়া লোকটিই চেয়ারম্যান টিপু সুলতান ও বাম পাশে সার্ট ইন করা লোকটি কামরুল হাসান জুয়েল।