ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ বাংলা

‎যথেষ্ট অবদান থাকলেও স্বীকৃতি মেলেনি বরগুনার মীর বজলুর রহমানের। ‎

গোলাম রাব্বি, বরগুনা:

‎১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশ না নিলেও নীরবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বরগুনার মীর বজলুর রহমান।

‎মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ফুটবল খেলে উপার্জিত অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিয়ে তিনি সহযোগিতা করেছিলেন স্বাধীনতার সংগ্রামে। অথচ সেই অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আজও মেলেনি।

‎বিজয়ের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও মীর বজলুর রহমানের নাম নেই মুক্তিযোদ্ধা বা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। তবে দেশরক্ষা বিভাগ থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি সনদপত্র। তৎকালীন সেনাপ্রধান মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর স্বাক্ষরিত ওই সনদে তাকে “বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক” হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয়—তিনি ৯ নম্বর সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, তার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরউজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

‎নিজের অবদানের কথা বলতে গিয়ে মীর বজলুর রহমান জানান, ফুটবল খেলার সময় বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার বাবা তাকে বরিশালের আসমত আলী খান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। সেখানে পুলিশ লাইনে ফুটবল খেলা শিখে তিনি দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও বরিশাল, হিজলা, মুলাদি, ঝালকাঠি ও আগৈলঝড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটবল খেলে যে অর্থ উপার্জন করেছেন, তা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেন।

‎তিনি বলেন, “তখন আমি কলেজে উঠেছি মাত্র। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু ও মেজর হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে বরিশাল জেলা দলের হয়ে খেলতাম। ভালো অর্থ আয় হতো, সবই মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছি।” মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা থেকে একবার তার নাম তালিকাভুক্ত হলেও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে জানানো হয়—তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রাখা সম্ভব নয়। এরপর আর কোথাও স্বীকৃতির জন্য যোগাযোগ করেননি বলেও জানান তিনি।

‎তবে বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রমাণ জমা দিতে প্রস্তুত আছেন বলেও উল্লেখ করেন।

‎খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭২ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিকম পাস করার পর নজরুল পাঠাগার অ্যান্ড ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবসহ বরিশাল জেলা দলের হয়ে টানা ২০ বছর ফুটবল ও ভলিবল খেলেছেন মীর বজলুর রহমান। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস, সাধারণ বীমা, শান্তিনগর স্পোর্টিং ক্লাব, ওয়ারী ক্লাব ও বিআরটিসিসহ বিভিন্ন ক্লাবের পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে ঢাকার মাঠ দাপিয়ে বেড়ান তিনি।

‎বর্তমানে বরগুনা পৌরসভার ব্রাঞ্চ রোড এলাকায় বসবাস করছেন এই ক্রীড়াবিদ। চরম দারিদ্র্য ও একাকীত্বের মাঝেও অবৈতনিক ফুটবল কোচ হিসেবে তিনি শিশু-কিশোরদের খেলায় প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার শিশু-কিশোরকে হাতে ধরে ফুটবল শিখিয়েছেন তিনি। যাদের অনেকেই বর্তমানে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের ক্লাবে খেলছেন।

‎এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বরগুনা জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক কমান্ডার মো. ইউসুফ আলী মৃধা বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও হয়েছে। তবে কেউ যদি কোনো তালিকাতেই অন্তর্ভুক্ত না থাকেন, তাহলে যাচাই-বাছাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়।

‎নীরবে দেশের জন্য অবদান রেখে যাওয়া মীর বজলুর রহমান আজও অপেক্ষায়—একটু স্বীকৃতির, ইতিহাসে নিজের নামটি ন্যায্য স্থানে উঠে আসার।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ইতালিতে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতির বার্ষিক আনন্দ ভ্রমণ: প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রবাসীদের দিনভর আনন্দ-উচ্ছ্বাস

‎যথেষ্ট অবদান থাকলেও স্বীকৃতি মেলেনি বরগুনার মীর বজলুর রহমানের। ‎

০৬:০৭:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫

গোলাম রাব্বি, বরগুনা:

‎১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশ না নিলেও নীরবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বরগুনার মীর বজলুর রহমান।

‎মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ফুটবল খেলে উপার্জিত অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিয়ে তিনি সহযোগিতা করেছিলেন স্বাধীনতার সংগ্রামে। অথচ সেই অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আজও মেলেনি।

‎বিজয়ের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও মীর বজলুর রহমানের নাম নেই মুক্তিযোদ্ধা বা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। তবে দেশরক্ষা বিভাগ থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি সনদপত্র। তৎকালীন সেনাপ্রধান মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর স্বাক্ষরিত ওই সনদে তাকে “বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক” হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয়—তিনি ৯ নম্বর সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, তার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরউজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

‎নিজের অবদানের কথা বলতে গিয়ে মীর বজলুর রহমান জানান, ফুটবল খেলার সময় বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার বাবা তাকে বরিশালের আসমত আলী খান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। সেখানে পুলিশ লাইনে ফুটবল খেলা শিখে তিনি দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও বরিশাল, হিজলা, মুলাদি, ঝালকাঠি ও আগৈলঝড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটবল খেলে যে অর্থ উপার্জন করেছেন, তা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেন।

‎তিনি বলেন, “তখন আমি কলেজে উঠেছি মাত্র। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু ও মেজর হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে বরিশাল জেলা দলের হয়ে খেলতাম। ভালো অর্থ আয় হতো, সবই মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছি।” মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা থেকে একবার তার নাম তালিকাভুক্ত হলেও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে জানানো হয়—তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রাখা সম্ভব নয়। এরপর আর কোথাও স্বীকৃতির জন্য যোগাযোগ করেননি বলেও জানান তিনি।

‎তবে বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রমাণ জমা দিতে প্রস্তুত আছেন বলেও উল্লেখ করেন।

‎খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭২ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিকম পাস করার পর নজরুল পাঠাগার অ্যান্ড ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবসহ বরিশাল জেলা দলের হয়ে টানা ২০ বছর ফুটবল ও ভলিবল খেলেছেন মীর বজলুর রহমান। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস, সাধারণ বীমা, শান্তিনগর স্পোর্টিং ক্লাব, ওয়ারী ক্লাব ও বিআরটিসিসহ বিভিন্ন ক্লাবের পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে ঢাকার মাঠ দাপিয়ে বেড়ান তিনি।

‎বর্তমানে বরগুনা পৌরসভার ব্রাঞ্চ রোড এলাকায় বসবাস করছেন এই ক্রীড়াবিদ। চরম দারিদ্র্য ও একাকীত্বের মাঝেও অবৈতনিক ফুটবল কোচ হিসেবে তিনি শিশু-কিশোরদের খেলায় প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার শিশু-কিশোরকে হাতে ধরে ফুটবল শিখিয়েছেন তিনি। যাদের অনেকেই বর্তমানে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের ক্লাবে খেলছেন।

‎এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বরগুনা জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক কমান্ডার মো. ইউসুফ আলী মৃধা বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও হয়েছে। তবে কেউ যদি কোনো তালিকাতেই অন্তর্ভুক্ত না থাকেন, তাহলে যাচাই-বাছাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়।

‎নীরবে দেশের জন্য অবদান রেখে যাওয়া মীর বজলুর রহমান আজও অপেক্ষায়—একটু স্বীকৃতির, ইতিহাসে নিজের নামটি ন্যায্য স্থানে উঠে আসার।