
খান আরিফুজ্জামান নয়ন,ডুমুরিয়া(খুলনা),প্রতিনিধিঃ
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের মঠবাড়িয়া গ্রামের প্রবীণ জেলে নিভাস বিশ্বাস। মৃত জ্যোতিষ বিশ্বাসের ছেলে তিনি। ১৯৮৫ সাল থেকে সুন্দরবনের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরছেন নিরলসভাবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝড়-জল, বৃষ্টি-রোদ উপেক্ষা করে টানা ৪০ বছর ধরে তিনি মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
প্রথম দিকে অন্যের ট্রলারে কাজ করতেন তিনি। কষ্টের টাকায় ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন নিজের ট্রলার। এখন নিজের ট্রলারে তিনি মাছ ধরতে যান আরও আটজন মৎস্যজীবী নিয়ে যার মধ্যে দুইজন তারই ছেলে, প্রতাপ বিশ্বাস ও প্রসাদ বিশ্বাস।
তবে এত বছরের শ্রম ও অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও নিভাস বিশ্বাস কখনো পাননি ‘মৎস্যজীবী’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি। জেলে আইডি কার্ড না থাকায় তিনি বিভিন্ন সময়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং সরকারিভাবে কোন সুযোগ-সুবিধা পাননি। মৎস্য অধিদপ্তরের কোস্টাল প্রকল্পের আওতায় গঠিত মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতিতেও তিনি অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।
চোখের সামনে তিনি দেখেছেন তারই গ্রামের অন্যান্য জেলেরা সরকারি প্রকল্প থেকে ঋণ, প্রশিক্ষণ, লাইফ জ্যাকেট ও মাছ ধরার জাল পেয়েছেন কিন্তু তিনি ও তার পরিবার থেকে গেছেন বঞ্চিত। তবুও হাল ছাড়েননি নিভাস বিশ্বাস। বহুবার মৎস্য অফিসে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিয়েও কার্ড পাননি।
অবশেষে সম্প্রতি মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির এক সভায় উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার। সেখানেই নিভাস বিশ্বাস তার দীর্ঘদিনের অভিমান ও কষ্টের কথা অকপটে জানিয়ে দেন অফিসারকে। মৎস্য অফিসার মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনেন এবং তাকে অফিসে কাগজপত্রসহ আসার অনুরোধ জানান।
কয়েকদিন পর নিভাস বিশ্বাস যখন ডুমুরিয়া উপজেলা মৎস্য অফিসে তার নথিপত্র জমা দেন, তখনই শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাকে জেলে আইডি কার্ড প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হয়। শুধু তাই নয়, তার নিজের ট্রলারের জন্য আর্টিশনাল ফিশিং ট্রলারের পারমিট সমুদ্র মাছ ধরার অনুমতিপত্রও প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার দুই ছেলের জেলে কার্ডের আবেদনও গ্রহণ করা হয়েছে।
এ যেন তার জীবনের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত। জেলে কার্ড হাতে পেয়ে আনন্দে চোখে জল আসে নিভাস বিশ্বাসের। তিনি বলেন “আমি কল্পনাও করিনি একদিন সত্যি জেলে কার্ড পাব। ৪০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরেও স্বীকৃতি পাইনি, আজ মনে হচ্ছে আমি সত্যিই একজন মৎস্যজীবী। তিনি মৎস্য অফিসারসহ মৎস্য অধিদপ্তর ও সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এই স্বীকৃতির জন্য।
এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান বলেন,”নিভাস বিশ্বাসকে জেলে আইডি কার্ড দিতে পেরে আমি এবং আমার সহকর্মীরা অত্যন্ত আনন্দিত। তার গ্রামের ঐ মিটিংয়ে উপস্থিত না হলে হয়তো তার সাথে কখনো দেখাই হতো না; জানা হতো না তার কষ্টের কথা। আমরা দুই দিনের মধ্যে তার ট্রলারের সাগরে মাছ ধরার অনুমতিপত্র করে দিয়েছি এবং ছেলেদের জেলেকার্ড করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। খুলনা বিভাগের সম্মানিত ডাইরেক্টর স্যার ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, খুলনা মহোদয়ের নির্দেশক্রমে এবং উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় উপজেলা মৎস্য অফিসের সকল সেবা দ্রুত ও সহজতর করার প্রচেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।নিভাস বিশ্বাসের এই অর্জন শুধু একটি কার্ড পাওয়া নয় এটি তার ৪০ বছরের কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও জীবনের সংগ্রামের প্রতীক। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তিনি যেন নিজের পরিচয়, গর্ব ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন ফিরে পেলেন।
নিভাস বিশ্বাসের এই গল্প বাংলাদেশের হাজারো অবহেলিত মৎস্যজীবীর আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। সরকারি স্বীকৃতি শুধু একটি কার্ড নয়, এটি একজন শ্রমজীবী মানুষের জীবনের স্বপ্নপূরণের প্রতীক।
প্রতিনিধির নাম 



















