
(গোলাম রাব্বি)
বরগুনা জেলা প্রতিনিধি:
দেখা হলো না পৃথিবীর আলো। চেনা হলো না মা-বাবাকে। গর্ভে থাকা অবস্থায় মা মেঘলা আক্তারের সাথেই চলে যেত হলো পরপারে। পৃথিবীতে আগাত নতুন মেহমানকে নিয়ে যেখানে পরিবারের সকলের আনন্দ ফুর্তি করার কথা, সেখানে এখন বুকফাটা আহাজারি আর কান্নার রোল। মায়ের সাথেই একসাথে উঠতে হয়েছে হাসপাতালের মর্গের টেবিলে। হৃদয়বিদারক এঘটনাটি ঘটেছে বরগুনার বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা বাজার সংলগ্ন নিবন্ধনহীন একটি ক্লিনিকের আবাসিক ডাক্তারের অপচিকিৎসার কারনে। তবে ক্লিনিকটি সিলগালা করন ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান।
মৃত ওই প্রসূতি মেঘলা আক্তার বামনা উপজেলার ৩নম্বর রামনা ইউনিয়নের বৈকালিন বাজার এলাকার তারিকুল ইসলামের তারেকের স্ত্রী এবং ৪নম্বর ডৌয়াতলা ইউনিয়নের গুদিঘাটা গ্রামের ছগীর হোসেন মেয়ে।
মেঘলার স্বামী তারেক সাংবাদিকদের জানান, তার গর্ভবতী স্ত্রী মেঘলা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য সোমবার বিকেল ৩টার দিকে ওই একই উপজেলার ৪ নম্বর ডৌয়াতলা ইউনিয়নের ডৌয়াতলা বাজার সংলগ্ন সুন্দরবন হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে আসে মেঘলার স্বামী তারেক ও বাবা ছগীর হোসেন। পরিক্ষা নিরীক্ষা শেষে বড় ডাক্তার আসার কথা বলে বিভিন্ন কৌশলে সময় ক্ষেপন করে সোমবার (১৫ জানুয়ারী) রাত সাড়ে আটটার দিকে মেঘলার শরীরে এ্যানেস্থেশিয়া পুশ করে ওই নিবন্ধনহীন অবৈধ ক্লিনিকের আবাসিক ডাক্তার সবুজ কুমার দাস। রাত ৯টার দিকে মেঘলাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে মেঘলার সিজারিয়ান অপারেশন করে আবার সেলাই করে পট্টি দিয়ে বাহিরে এসে মেঘলার স্বজনদের আবারও পার্শ্ববর্তী উপজেলা পাথরঘাটা থেকে বড় ডাক্তার আসার কথা বলে রাত প্রায় ১১ টা পর্যন্ত সময় ক্ষেপন করে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। পরে রাত ১১টার দিকে খাদিজা বেগম নামের এক নারী এসে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে রোগীর অবস্থা আশংকা জনক জানিয়ে মেঘলাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালে নেওয়ার কথা বললে তাৎক্ষণিক এ্যাম্বুলেন্স যোগে বরিশালে যাওয়ার পথে ভান্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেঘলাকে নিয়ে গেলে ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগে চিকিৎসক পরিক্ষা নিরীক্ষা করে দুই ঘন্টা আগেই মেঘলার মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজনদের নিশ্চিত করে।
পরে সুন্দরবন হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রসূতির মৃত্যুর খবর জানতে পেরে বরগুনা সিভিল সার্জন ডাক্তার মোহাম্মদ ফজলুল হক বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান ও বামনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তুষার মন্ডল কে ঘটনা স্থলে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান নিবন্ধনহীন ওই অবৈধ ক্লিনিকটি সিলগালা করে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা নিতে নির্দেশ প্রদান করেন।
আরো জানা গেছে, ওই ক্লিনিকে রোগী অজ্ঞান করাতে এ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার জন্য স্থায়ী কোন ডাক্তার নেই। তবে ডাক্তার সবুজ কুমার দাসই রোগীদের এ্যানেস্থেশিয়া পুশ করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে ডাক্তার সবুজ কুমার দাসের নাম ফলকে তার এ্যানোস্থোলিষ্ট ডিগ্রির কোন প্রমান পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর থেকেই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ গা-ঢাকা দেওয়ায় কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব, আল ইমরান সাংবাদিকদের জানান, খবর পেয়ে আমরা ঘটনা স্থলে গিয়ে ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়েছে এবং ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা নিতে বলা হয়েছে। মরদেহ বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে মর্গে পোসমার্টেম করানোর জন্য পাঠানো হয়েছে।
বরগুনা সিভিল সার্জন ডাক্তার মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, সুন্দরবন হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের ওই ক্লিনিকের কোন নিবন্ধন নেই কিংবা নিবন্ধনের জন্য কোন আবেদনও করেনি। প্রসূতির মৃত্যুর খবর পেয়ে যথাযথ ব্যাবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বামনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে ওই অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন। জেলার সবগুলো অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের এ অভিযান চলমান থাকবে।
উল্লেখ্য, ডৌয়াতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বামনা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান সুন্দরবন হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের ওই অবৈধ ক্লিনিকের চেয়ারম্যান। তার প্রভাবেই তার নিজ দলীয় প্রভাবশালী কয়েকজন লোক নিয়ে অবৈধভাবে ক্লিনিকটির কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রতিনিধির নাম 


















