
মোঃ হিমেল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে ‘টিম zAI BD’। জাতিসংঘ আয়োজিত বৈশ্বিক এআই হ্যাকাথন ২০২৬-এ ৩৭টি দেশের কয়েক শ দলকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশি দলটি। দলের নেতৃত্বে ছিলেন নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার সন্তান আবু নাছের মুহা. নাফিউ। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি ‘ক্লজচেইন’ (ClauseChain) নামের এআই প্ল্যাটফর্ম প্রতিযোগিতায় বিচারকদের মূল্যায়নে সেরা নির্বাচিত হয়।
গত ১৫ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে জাতিসংঘ সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফাইনালে বাংলাদেশের দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। নাফিউর এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের খবরে তাঁর সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দ ও গর্বের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিযোগিতায় দলটির তৈরি ক্লজচেইন প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন দেশের আইন ও বিধিমালা বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই করতে পারে। ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা তথ্যের উৎস পর্যন্ত যাচাই করা সম্ভব।
দলটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্লজচেইন বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও পূর্ব তিমুরসহ ১১টি দেশের আইন বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। ১ হাজার ৪৯টি সরকারি উৎস থেকে সংগৃহীত ৭৪৬টি আইন ও বিধিমালা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এতে ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি আইনি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উন্মুক্ত সোর্স প্রযুক্তির ভিত্তিতে তৈরি প্ল্যাটফর্মটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় তুলে ধরেছে।
‘ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল হ্যাকাথন ২০২৬: ইউজিং এআই ফর ডিজিটাল ট্রেড রেগুলেটরি অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক এই প্রতিযোগিতার আয়োজক জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ইউএনএসকাপ)। ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান বিশ্লেষণের জন্য কার্যকর, উন্মুক্ত ও নির্ভরযোগ্য এআই প্রযুক্তি তৈরি করাই ছিল প্রতিযোগিতাটির মূল উদ্দেশ্য।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে কয়েক ধাপের বাছাইপ্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছায় বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের দল। ফাইনালে প্রতিটি দলকে আগে থেকে জানানো হয়নি—এমন একটি দেশ ও নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে হয়। বিচারকেরা সরাসরি প্রতিটি দলের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এর সক্ষমতা যাচাই করেন। উপস্থাপনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বের মূল্যায়ন শেষে বাংলাদেশের দলকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশের এই সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিরেন)। প্রতিষ্ঠানটির ডেটা সেন্টারে থাকা এনভিডিয়া ডিজিএক্স স্পার্ক কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে দলটি নিজস্বভাবে ভাষা মডেল, টেক্সট বিশ্লেষণ মডেল ও অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর) প্রযুক্তি পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। ফলে বিদেশি বাণিজ্যিক এআই সেবা কিংবা এপিআইয়ের ওপর নির্ভর না করেই প্ল্যাটফর্মটির গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রতিযোগিতায় প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দলনেতা আবু নাছের মুহা. নাফিউ বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যার প্রতিটি তথ্য মূল সরকারি নথি পর্যন্ত যাচাই করা যায়। বিডিরেনের ডেটা সেন্টারের ডিজিএক্স স্পার্ক আমাদের দেখিয়েছে, বাংলাদেশের নিজস্ব অবকাঠামোতেই বিশ্বমানের এআই চালানো সম্ভব। এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের।”
নাফিউ বদলগাছী সদর ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাবা আবুল হোসেন একজন শিক্ষক। তিনি বদলগাছী সরকারি মডেল পাইলট হাইস্কুলের ২০১০ সালের ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিদ্যালয়জীবন থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত নাফিউ পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে উপজেলায় সেরা হওয়ার পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে উপজেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন বলে জানান তাঁর সাবেক শিক্ষক।
বদলগাছী সরকারি মডেল পাইলট হাইস্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. মুজাফফর হোসেন উকিল বলেন, “নাফিউ খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে, অষ্টম শ্রেণিতেও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে উপজেলা সেরা হয়েছে। এরপর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে আবারও উপজেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে। তার এই আন্তর্জাতিক সাফল্যে শিক্ষক হিসেবে আমি সত্যিই অনেক গর্বিত। তার জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইল।”
নাফিউর নেতৃত্বে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দলের অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্কের সিনিয়র ডেভেলপার ও এআই প্রকৌশলী পুনম চৌধুরী, এআই প্রকৌশলী মো. সানিউল বাসির সাজ এবং আইনি পর্যালোচক মো. ইনসাফুল রহমান তুষার। গবেষণা তত্ত্বাবধানে ছিলেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নওশিন আমিন শেখ।
নাফিউর এই অর্জনের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বদলগাছীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তাঁর এই সাফল্য এলাকার তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।










