
মো: হিমেল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার রাতের কোনো একসময় ভেঙে পড়ার ঘটনায় এলাকায় আলোচনা ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শহীদ মিনারটি পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে, নাকি দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণতা ও নির্মাণগত দুর্বলতার কারণে ধসে পড়েছে—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ভোর ৬টার মধ্যে যেকোনো একসময় উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের বৈকুণ্ঠপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে বিদ্যালয় এলাকায় স্থানীয় লোকজন জড়ো হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার দিকে বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের মুদিদোকানি সেকেন্দার আলী (৫৫) পানি নিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যান। এ সময় তিনি শহীদ মিনারটি ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে বিষয়টি আশপাশের লোকজনকে জানানো হলে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে খবর দেওয়া হয় পুলিশকে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বৈকুণ্ঠপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় ২০১৬ সালে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। বিদ্যালয়ের জায়গায় নির্মিত রাস্তার পাশের আধাপাকা দোকানের একজন ভাড়াটে দোকানদার মো. সাগর হোসেন নিজ অর্থায়নে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করে দেন। এরপর থেকে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সেখানে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হতো।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত ক্রিকেট ও ফুটবল খেলা হতো। ইট দিয়ে নির্মিত শহীদ মিনারটির ভেতরে রডের কোনো বাঁধন ছিল না বলেও দাবি করেছেন তাঁদের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোটির একটি স্তম্ভে ফাটল ছিল এবং সেটির কিছু অংশ আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এসব কারণে শহীদ মিনারটি দুর্বল হয়ে পড়ে ভেঙে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়দের একাংশ।
অন্যদিকে, স্থানীয়দের আরেকটি পক্ষের সন্দেহ, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং শহীদ মিনারটি ভাঙচুর করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের সন্দেহের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা জানা যায়নি। ফলে ঘটনাটি দুর্ঘটনা, নাকি ইচ্ছাকৃত ভাঙচুর—তা নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শুকলা রানী বলেন, “শহীদ মিনারটি আগে থেকেই জরাজীর্ণ ও নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কারও কোনো ব্যক্তিগত বা স্থানীয় বিরোধ নেই। জাতীয় দিবসগুলোতে সবাই মিলে এখানেই শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।”
রাতে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, নতুন সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী প্রহরীদের রাতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকায় ওই রাতে বিদ্যালয়ে কেউ দায়িত্বে ছিলেন না।
ঘটনার খবর পেয়ে বদলগাছী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান ও উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুলের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশ ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায়।
বদলগাছী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সাইদুর রহমান বলেন, “ঘটনাটি জানার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রধান শিক্ষককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
বদলগাছী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”
শহীদ মিনার কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও জাতীয় চেতনার প্রতীক। তাই বৈকুণ্ঠপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারটি কী কারণে ভেঙে পড়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।










