
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, স্কুল ড্রেস বিক্রি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং নানা অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দা সুরাইয়া বেগম শেলীর অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত দুই দিন ধরে কোনো শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে পাঠাননি অভিভাবকরা। ফলে টানা দুই দিন শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীশূন্য থাকায় পাঠদান কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার বিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধন করা হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক নিয়মিতভাবে অভিভাবকদের সঙ্গে অশালীন ও আপত্তিকর আচরণ করেন। কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন। এছাড়া তিনি স্কুল ড্রেসের ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাজার থেকে ড্রেস বানাতে দেওয়া হয় না, প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকেই ড্রেস কিনতে বাধ্য করা হয়। নিজের ইচ্ছামতো ড্রেসের রং পরিবর্তন করায় অভিভাবকরা বারবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, যা গরিব অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হচ্ছে বিদ্যালয় ভবনের তৃতীয় তলায়। এতে শিশু শিক্ষার্থীদের উঠানামায় মারাত্মক কষ্ট হয়। নিচতলায় পর্যাপ্ত কক্ষ খালি থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক তৃতীয় তলায় পাঠদান করানোর সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন। এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার কয়েকজন অভিভাবক কথা বলতে গেলে প্রধান শিক্ষক তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন এবং শিক্ষার্থীসহ তাদের বিদ্যালয় ত্যাগ করতে বলেন।
এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত বুধবার থেকে অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দেন। ওই দিন বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকায় সহকারী শিক্ষকরা সারাদিন বসে থেকে বাড়ি ফিরে যান। পরে দুপুরে অভিভাবকরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন।
আজ বৃহস্পতিবারও বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী আসেনি। একই সঙ্গে দুপুরে প্রধান শিক্ষকের অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন করেন অভিভাবকরা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবকরা জানান, এমন স্বেচ্ছাচারী, দুর্নীতিবাজ ও অশালীন আচরণকারী প্রধান শিক্ষককে অপসারণ না করা পর্যন্ত তারা তাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাবেন না।
পারভীন আক্তার নামে এক অভিভাবক বলেন, আমার তিন নাতী এই স্কুলে পড়াশোনা করে। একজন শিশু শ্রেণিতে, একজন ক্লাস ওয়ান ও অপরজন ক্লাস ফোরে পড়ে। জানুয়ারির শুরুতে স্কুল ড্রেস বানাতে বলা হলে বাজার থেকে দুইজনের ড্রেস বানিয়ে আনি। কয়দিন পর প্রধান শিক্ষক বলেন- ড্রেসের রং পরিবর্তন হয়েছে এবং তার কাছ থেকে নতুন ড্রেস কিনতে হবে। বিষয়টি সদয়ভাবে বিবেচনার অনুরোধ জানালে প্রধান শিক্ষক কটাক্ষ করে বলেন, ‘এতো বাচ্চা কেন পয়দা দিয়েছেন’। ড্রেস না কিনলে ঘাড় ধরে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে।
এছাড়া প্রিয়া আক্তার ও ঝর্ণা আক্তারসহ অসংখ্য অভিভাবকের একইরকম অভিযোগ। তারা জানান, গত ২২ বছর ধরে এভাবেই ক্ললটা চলাচ্ছেন এই প্রধান শিক্ষক। তিনি কারো কথা শুনেন না, নিজের ইচ্ছে মতো যা খুশি করেন। কোন বিষয়ে দ্বিমত করলে অভিভাবকদের অপমান করে বের করে দেন। আমরা তার (প্রধান শিক্ষক) অপসারণ চাই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোফাজ্জল হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষকের আচরণ খুবই খারাপ। এমন কোন অভিভাবক নেই যার সাথে তিনি খারাপ আচরণ করেননি। কিছু কিছু অভিভাবকে তিনি ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছেন। অভিভাবকদের তিনি অশালীন ভাষায় গালাগাল করেন। একটা প্রশংসাপত্র নিতে গেলে ৫০ টাকা দিতে হয়। সৃজনী বাবদ ১৫-৩০ টাকা নেন। না দিলে শিক্ষার্থীদের ঘাড় ধরে বের করে দেন। এসব নিয়ে অসংখ্যবার দেনদরবার হয়েছে। এসব বিষয়ে অভিভাবকরা এই পর্যন্ত শতাধিকবার আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। এবার অভিভাবকরা আন্দোলন শুরু করেছেন। দুইদিন ধরে কোন শিক্ষার্থী স্কুলে আসছে না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি-আপনারা স্কুলটাকে বাঁচান।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ মোট ৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। ২০০৩ সাল থেকে এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দা সুরাইয়া বেগম শেলী।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সৈয়দা সুরাইয়া বেগম শেলী বলেন, সবকিছু ষড়যন্ত্র। আমি কোন অভিভাবকের সাথে খারাপ আচরণ করিনি। একটি চক্র ষড়যন্ত্র করে এাব করছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন বলেন, অভিভাবকদের দেওয়া অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, বিষয়টি জেনেছি। উভয়পক্ষকে ডেকে কথা বলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল আজম বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে।
বিষয়টি অবহিত করলে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে।
