বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

জানাযা ও কাফন দাফনে বিলম্ব করার সামাজিক ট্রেন্ড! এই কুপ্রথার অবসান হোক- মুফতি মুহাম্মদ ওসমান সাদেক

নুরুল কবির আরমান,

বিশেষ প্রতিনিধি।।
এক আমেরিকান প্রবাসির মমতাময়ী মায়ের ইন্তেকাল হলো গতকাল বিকালে। জানাযা পড়ালাম এশার নামাজের পর। জানতে চাইলাম
দাফন কোথায় কখন হবে? তারা বললো, মরহুমার বড় ছেলে আমেরিকা থেকে আসার পর দাফনের কাজ হবে গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে।
জিজ্ঞেস করলাম, আসতে কত দিন লাগবে? তারা বললো, সর্বোচ্চ দুই, তিন দিন। বললাম, এতো লম্বা সময় দাফন না করে মৈয়তকে ফ্রিজিং করে রাখাতো ইসলামি শরীয়াহ মোটেও পছন্দ করে না। কারণ এতে করে মৃত মানুষটির রুহ কষ্ট পাচ্ছে। প্রবাসী ছেলে এসে একটু খানি মায়ের মুখটি দেখবে। ব্যাস্ এতটুকুই।
আর কি করতে পারবে! মায়ের প্রতি ছেলের এই আবেগ মায়েরতো এক পয়সারও কোন লাভতো নেই নেই, উল্টো মায়ের যে রুহ কষ্ট পাচ্ছে!
যদি তিনি ঈমানদার হন তবে তিনিতো তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করতে ছটপট করছেন। আর তার প্রবাসি ছেলে নিজের আবেগ দেখানোর জন্য তার মাকে এভাবে ফ্রিজিং করে আটকে রাখছেন।

আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে এই প্রথাটি চালু আছে। সঙ্গত কারণ ছাড়াই অনর্থক লাশ কাফন-দাফন করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা হয়। সমাজে যিনি যত বড় হয়ে থাকেন তার লাশ কাফন-দাফনে তত বেশি বিলম্ব করা হয়। ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যদি কেউ দেশের বাইরে থাকে, তাহলে তাদের দেশে ফেরা পর্যন্ত লাশ দাফন করা হয় না। বরং মৃতব্যক্তিকে হাসপাতালের হিমঘরে রেখে দেওয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায় ভিসা জটিলতার কারণে আত্মীয়-স্বজনদের দেশে ফিরতে দু’চার দিন বা দু’এক সপ্তাহ দেরি হয়। এতদিন পর্যন্ত লাশ কবরস্থ করা হয় না। কিন্তু লাশ কাফন-দাফনের ক্ষেত্রে এ ধরণের বিলম্ব করার কোন অনুমতি ইসলামে নেই। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাষায় বিলম্ব করা থেকে নিষেধ করেছেন।
হাদীসে মৃত্যুর পর বিলম্ব না করে কাফন, জানাযা দ্রুত সম্পন্ন করে তাড়াতাড়ি দাফন করে দেওয়ার তাকিদ করা হয়েছে।
১. রাসূল সাল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
انّ طلحة بن البراء رضى الله عنه مرض فاتاه النبى عليه السلام يعوده فقال انى لارى طلحة الا قد حدث فيه الموت فاذنونى به وعجّلوا فانه لاينبغى لجيفة مسلم ان تحبسছ بين ظهرانى اهله ـ
অর্থ ঃ হযরত তালহা রা. অসুস্থ ছিলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য আসলেন। অতঃপর তাঁকে দেখে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তো দেখছি সে মারা গেছে। তোমরা খুব দ্রুততার সাথে কাফন-দাফনের ব্যবস্থা কর এবং আমাকে সংবাদ দাও। কারণ, কোন মুসলমানের লাশ মৃত্যুর পর ( দ্রুত কবরস্থ না করে) তার পরিবারের মাঝে ফেলে রাখা ঠিক নয়। (আবু দাউদ শরীফ, খ: ২, পৃ: ৪৫০)
২. রসূলুল্লাাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাাাম আরো ইরশাদ করেন।

عن عبد الله بن عمر رضى الله عنه قال سمعت النبى صلى الله عليه وسلم يقول اذا مات احدكم فلا تحبسوه و اسرعوا به الى قبره وليقرأ عند رأسه فاتحة البقرة وعند رجليه بخاتمة البقرة ـ
অর্থ ঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি যে, তিনি ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যখন কোন ব্যক্তি ইন্তেকাল করে তখন তাকে তোমাদের মাঝে আটকে রেখ না বরং তোমরা তাকে অতি দ্রুত কবরস্থ করার জন্য কবরের দিকে নিয়ে যাও এবং তার মাথার দিকে দাঁড়িয়ে সূরা বাকারার প্রথম অংশ এবং পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে সূরা বাকারার শেষের অংশ পাঠ কর। (বাইহাকী শরীফ, মিশকাত শরীফ, খ: ১, পৃ: ১৪৯)
৩. আরো একটি হাদীসে এসেছে।
عن على بن ابى طالب رضى الله عنه انّ رسول الله صلى الله عليه وسلم قال له يا على ثلاث لاتؤخرها الصلوة اذا انت والجنازة اذا حضرت والايّم اذا وجدت لها كفوًا ـ
অর্থঃ হযরত আলী রা. সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী রা. কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘হে আলী! ৩টি জিনিসের ক্ষেত্রে বিলম্ব করবে না। ১. নামাযের যখন সময় আসবে তখন নামায আদায় করা থেকে দেরি করবে না। ২. মৃত ব্যক্তির জানাযা যখন উপস্থিত হবে তখন কাফন-দাফন সম্পন্ন করতে দেরি করবে না। ৩. কোন অবিবাহিতা মেয়ের জন্য যখন কোন উপযুক্ত পাত্র পাবে তখন তাকে পাত্রস্থ করা থেকে বিলম্ব করবে না।’ (তিরমিযী শরীফ, খ: ১, পৃ: ২০৬)
৪. আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লালাম বলেন।
عن ابى هريرة رضى الله عنه عن النبى عليه السلام قال اسرعوا بالجنازة فان تك صالحة فخير تقدموها وان تك سوى ذلك فشر تضعونه عن رقابكم ـ
অর্থ ঃ হযরত আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা মৃত ব্যক্তির জানাযার খাটলি নিয়ে দ্রুতবেগে যাও (কবরস্থ করার জন্য)। কারণ, মৃত ব্যক্তি যদি নেক্কার হয় তাহলে তো তোমরা তাঁকে কল্যাণের নিকটবর্তী করে দিলে, আর যদি সে নেক্কার না হয় তাহলে এক অকল্যাণকে তোমাদের কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলে। (বুখারী শরীফ, খ: ১, পৃ: ১৭৬)

উপরোক্ত হাদীসে মৃত্যুর পর বিলম্ব না করে কাফন, জানাযা দ্রুত সম্পন্ন করে তাড়াতাড়ি দাফন করে দেওয়ার তাকিদ করা হয়েছে।

থেকে আরও পড়ুন