
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় ৮ বছর বয়সী এক মাদরাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনা সমাধানের জন্য সালিসের আয়োজন করে স্থানীয় মাতব্বরেরা। তবে সালিসের নামে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ করে তা প্রত্যাখ্যান করে ভুক্তভোগীর পরিবার। পরে ক্ষিপ্ত মাতব্বরের লোকজন ভুক্তভোগীর বাড়ি ঘরে হামলা চালায় ও ভাঙচুর করে। এসময় দুইজন আহত হয়। পরে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
গত বুধবার উপজেলার সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের সহিলদেও গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম মাওলানা মো. শহীদুল্লাহ (২৫)। তিনি উপজেলার সদিলদেও পুরাতন বাজার এলাকায় অবস্থিত ‘জামিয়া হুসাইনীয়া ও হযরত সাওদা (রা.) ক্বওমী মহিলা মাদরাসা’র শিক্ষক। তিনি পাশ্ববর্তী কমলপুর গ্রামের বাসিন্দা।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে,
১৫-২০ দিন আগে ওই মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মো. শহীদুল্লাহ। যোগদানের পরই মাদরাসার ছাত্রীদের ওপর কুনজর দেন তিনি। পড়ানোর সময় নানা বাহানায় তাদের গায়ে হাত দিতেন শহীদুল্লাহ। গত বুধবার বিকালে মাদরাসা ছুটির পর ওই ছাত্রী ও তার দুই চাচাতো বোনকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য থাকতে বলেন শহীদুল্লাহ। ছুটির পর তারা থেকে যায় আর অন্য শিশুরা চলে যায়। কিছু সময় পর ছোট দুই বোনকে পাশের বাজারে বিস্কুট খাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দেন তিনি। এদিকে খালি মাদরাসায় ভুক্তভোগীকে এক পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালান শহীদুল্লাহ। তার চিৎকারে ওই ছোট দুই বোন ফিরে এলে শহীদুল্লাহ তাকে ছেড়ে দেয়। ঘটনা বাড়িতে না জানাতে হুমকিও দেন শহীদুল্লাহ
তবে ভুক্তভোগী শিশুটি কান্নারত অবস্থায় বাড়িতে গিয়ে তারা বাবা-মাকে ঘটনা খুলে বলে। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে জানানোর পাশাপাশি থানায় অভিযোগ জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতারা সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন। এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক মাদরাসা ছেড়ে পালিয়ে যায়। দুদিন পর শুক্রবার সকালে সালিস বসলেও অভিযুক্ত শিক্ষক উপস্থিত হননি, তবে মাতাব্বর হিসেবে বিএনপি নেতারা ওই শিক্ষককে মাফ করে দেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারকে চাপ দেন। এদিন আর বিষয়টি সমাধান হয়নি। পরে গত শনিবার মাতাব্বরদের উদ্যোগে ফের সালিসের বসে উভয়পক্ষ। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করা হলেও এদিন অভিযুক্ত শিক্ষককে চাইতে বলে ঘটনা এখানেই শেষ করতে চাপ দেন মাতব্বররা। এমন সিদ্ধান্ত ভুক্তভোগীর পরিবার প্রত্যাখ্যান করায় উপস্থিত মাতব্বর ও বিএনপি নেতারা ক্ষিপ্ত হন এবং তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। কিছু সময় পর ভুক্তভোগীর বাড়িতে হামলা চালানো হয়। এসময় বাড়িতে থাকা দুজন আহত হন। এরপর থেকে ভয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারের লোকজন এলাকায় চলাফেরা করতে পারছেন না।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর বাবা আজিজুল ইসলাম বলেন, কতটুকু খারাপ হলে এমন ছোট একটা শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করতে পারে। এমন শিক্ষক কোন মাদরাসায় থাকলে কোন শিক্ষার্থীই নিরাপদ নয়। আমরা এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছিলাম। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি নেতারা সালিসের নামে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারা সালিসে আমাদেরকে কোন কথাই বলতে দেননি। নিজেরা একতরফাভাবে ঘটনা শেষ করে দিতে চেয়েছেন। তারা জোর করেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করাতে চেয়েছিল। আমরা সালিসের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করায় মাতব্বররা ক্ষিপ্ত হন। পরে বাড়িতে হামলা করে নেতাদের লোকজন। এখন আমরা অবরুদ্ধ অবস্থায় আছি। থানায়ও যেতে পারছি না। আমাদের তিন ভাইয়ের তিনটা অটোরিকশা রয়েছে, তাদের ভয়ে বাড়ি থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হতে পারছি না।
ভুক্তভোগীর চাচা মিজানুর রহমান বলেন, নেতাদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত না মানায় আমাদের বাড়িতে হামলা হয়েছে। অটোরিকশা চালিয়ে আমরা তিন ভাই সংসার চালাই। রাস্তায় মাতব্বরদের বাড়ি হওয়ায় অটোরিকশা নিয়ে বের হতে পারছি না। রাস্তায় পেলে হামলা করবে বলে আমাদের হুমকি দিয়েছে।
সালিসের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. আনিছ খান বলেন, বিষয়টা জানার পর আমরা স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেই।পাশের কয়েকটি ওয়ার্ডের নেতারাও ছিলেন ওই সালিসে। এলাকায় ছোটখাটো কিছু ঘটলে আমরা মাতব্বররাই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করি। এটাও সমাধান করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু উচ্ছৃঙ্খল পোলাপান আমাদের সালিস না মেনে উল্টো আক্রমণ করতে চেয়েছিল। এখন বদনাম ছড়াচ্ছে আমরা নাকি টাকা খেয়ে ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেয়েছি। এমন অভিযোগ পুরোই মিথ্যা।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক শহীদুল্লাহর মোবাইফোনে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর সংয়োগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসার মোহতামিম মাওলানা সোহেল আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। প্রশ্নের এক পর্যায়ে বলেন, ওইরকম কোন ঘটনা ঘটেনি, ওই ছাত্রীকে পড়াশোনার জন্য মারধর করেছিলেন শহীদুল্লাহ।
আজ সোমবার বিষয়টি অবহিত করলে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, এ বিষয়ে এখনো থানায় কেউ অভিযোগ করেনি। এমনকি ফোনেও কেউ বিষয়টি জানায়নি। অভিযোগ দেওয়া হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
