বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও কূটনৈতিক এলাকা গুলশানে আবাসিক ভবনের আড়ালে গড়ে উঠেছে অসামাজিক কাজের বিশাল নেটওয়ার্ক। ২০২৩ সালে সিটি করপোরেশনের অভিযানের সময় ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে দুই নারীর আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনার পরও থমকে থাকেনি এই অবৈধ কারবার। একই ভবনে নতুন পরিচয়ে আবারও গজিয়ে উঠেছে ১৭ রুমের বিশাল স্পা সেন্টার। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এর মূল হোতা নুর ইসলাম এবং তার পার্টনার জাকির ও লাকির চাঞ্চল্যকর অপরাধের আমলনামা।
গুলশান-২ নম্বরের ৪৭ নম্বর সড়কের ২৫ নম্বর আবাসিক ভবন। ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি ভবনটিতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) অভিযানের সময় বিল্ডিং এর ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যান দুই নারী—যার পেছনে ছিল পায়েল নামে এক নারীর পরিচালিত অনৈতিক স্পা সেন্টার।
সেই বিভীষিকাময় ঘটনার পর কিছুদিন বিরতি থাকলেও বর্তমানে একই ভবনের লিফটের ৪ তলায় পাশাপাশি দুটি ইউনিট দখল করে মোট ১৭টি রুম নিয়ে পুনরায় ডেরা গেড়েছে ‘নুর ইসলাম’ ও তার পার্টনার ‘জাকির’। মাত্র একটি সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে আবাসিক ভবনে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পরিচালিত হচ্ছে এই অসামাজিক কর্মকাণ্ড।
নুর ইসলামের অপকর্মের জাল কেবল ৪৭ নম্বর সড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। সাবেক গুলশান থানার ঠিক পাশেই—৫৫ নম্বর সড়ক, এভারগ্রিন মাহের টাওয়ার (লিফটের ১৩ তলা), প্যালেস, ১২/এ, গুলশান নর্থ অ্যাভিনিউ—ঠিকানায় পরিচালিত হচ্ছে তাদের আরেকটি স্পা সেন্টার, যার নাম ‘সেভেন ডোরস’।
১৪টি রুম নিয়ে গঠিত এই সেন্টারটির পার্টনার হিসেবে সরাসরি কার্যালয় পরিচালনা করেন ‘লাকি’ নামে এক নারী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তারা বেছে নিয়েছে অভিনব কৌশল—সেন্টারটির অন্দরসজ্জা হুবহু কোনো আধুনিক হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো। কেবল তাই নয়, বাইরে থেকে কেউ হঠাৎ প্রবেশ করলে যাতে চিকিৎসা সেবা মনে হয়, সেজন্য সেখানে সর্বক্ষণ বসিয়ে রাখা হয় একজন ভূয়া ডাক্তার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নুর ইসলাম এই অবৈধ ব্যবসার পুরোনো খেলোয়াড়। এর আগেও বনানীর আউয়াল টাওয়ার এবং গুলশান ল্যাবেইড হাসপাতালের পাশের ভবনে তিনি একই ধরনের অসামাজিক স্পা সেন্টার পরিচালনা করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন স্থানে নিজেকে ‘প্রশাসনের লোক’ দাবি করে দাপট দেখান নুর ইসলাম। বর্তমান গুলশান থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে গভীর সখ্য রয়েছে—এমন ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং তাদের নাম ভাঙিয়ে এই সিন্ডিকেট এতদিন প্রকাশ্যে বেআইনি কাজ চালিয়ে আসছে।
অপরাধীরা যেখানে পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়, সেখানে কূটনৈতিক পাড়ার মতো সংবেদনশীল এলাকায় এত বড় অসামাজিক কারবার কীভাবে প্রকাশ্যে চলে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশের নাকের ডগায় এমন কর্মকাণ্ডে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে, তবে কি প্রশাসনের অসাধু কোনো মহল গোপন সহায়তায় রয়েছে এদের পেছনে?
একটি মাত্র ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে আবাসিক ভবনে ভূয়া ক্লিনিকের আবরণে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালানো নুর ইসলাম, জাকির ও লাকিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। গুলশানের আইনশৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ কাম্য।
চোখ রাখুন ]
কাকে কত টাকা দেওয়া হয়? কার মাসের পেমেন্ট কত? কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়ে নুর ইসলাম এই সাম্রাজ্য চালাচ্ছে—সব তথ্য উন্মোচন করা হবে আমাদের অনুসন্ধান সিরিজের আগামী পর্বে...