নেত্রকোনা প্রতিনিধি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলের কৃষি আজ বহুমুখী সংকটে পড়েছে। খরা, বন্যা, আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল, আফাল-আফার, বজ্রপাত, অতিরিক্ত গরম ও শৈত্যপ্রবাহ—সবকিছু সামাল দিয়েই যুগের পর যুগ হাওরের মানুষ টিকে আছে। তবে জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে এই সংকট দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে হিমালয় অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের হাওর পর্যন্ত জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কৃষিপ্রতিবিদ্যা (Agroecology) চর্চাকেই টেকসই সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আজ রোববার দুপুরে নেত্রকোনার মদন উপজেলার শান্তিপাড়া কৃষিপ্রতিবিদ্যা কেন্দ্র শিখন কেন্দ্রে এক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা করা হয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজ (বারসিক)-এর আয়োজনে ও দাতা সংস্থা অক্সফামের আর্থিক সহযোগিতায় এ আলোচনা সভা করা হয়।
এতে নেপালের সোশাল ওয়ার্ক ইনস্টিটিউটের ছয়জন উন্নয়ন কর্মী, বারসিকের পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ্বাস, আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো, অহিদুর রহমান, সহযোগি সমন্বয়কারী শংকর ম্রংসহ হাওরাঞ্চলের ১৫ জন কৃষক প্রতিনিধি অংশ নেন।
সভায় মদন ইউনিয়ন ও গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের কুলিয়াটি, উচিতপুর, পশ্চিমপাড়া, বারঘরিয়া, ভূঁইয়াহাটি ও খালাসিপাড়া গ্রামের কৃষক-কৃষাণিরা হাওরাঞ্চলের নানাবিধ সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা আগাম বন্যায় ফসলহানি, ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ক্ষতি, বর্ষাকালে সবজির জন্য বাজারনির্ভরতা, ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডায় ফসলের ক্ষতি, ঢেউয়ের কারণে বসতভিটা ভাঙন, রোগবালাই বৃদ্ধি, তাপদাহ, সেচের পানির সংকট ও বিষাক্ত রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহারের মতো সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেন।।একই সঙ্গে এসব সংকট মোকাবিলায় তারা যে লোকায়ত ও কৃষিপ্রতিবিদ্যাভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, সেগুলোও উপস্থাপন করেন।
কৃষকেরা জানান, তারা সংরক্ষিত পানির ব্যবহার করে চৈত্র-বৈশাখ মাসে সেচ দেন, রাসায়নিক সারের পরিবর্তে অল্প পরিমাণ গোবর সার ও কেঁচো কম্পোস্ট ব্যবহার করেন এবং ফসলের রোগবালাই দমনে জৈব বালাইনাশক তৈরি করে প্রয়োগ করেন। বসতভিটা রক্ষায় বাড়ির চারপাশে ভেন্নাগাছ, উজাওরি, মুর্তাগাছ, কচুরিপানা, হিজল ও করচ গাছ রোপণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া অনেক কৃষক নিজের বাড়িতেই সবজির বীজ সংরক্ষণ করছেন। বর্ষাকালে শাকসবজির ঘাটতি পূরণে বস্তা পদ্ধতি, টাওয়ার পদ্ধতি ও ঘরের চাল ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করছেন। স্থানান্তর পদ্ধতিতে চারার বীজতলা তৈরির অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়।
মতবিনিময় সভায় নেপালের উন্নয়ন কর্মীরা তাদের দেশের কৃষক ও কৃষিব্যবস্থায় জলবায়ু সংকট মোকাবিলার বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। দুই দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কৃষিপ্রতিবিদ্যার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আয়োজকেরা বলেন, হাওরাঞ্চলসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কৃষকদের টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিনির্ভর, কম খরচের ও টেকসই কৃষিপ্রতিবিদ্যা চর্চাই হতে পারে ভবিষ্যতের প্রধান ভরসা।