রিয়াজ ইসলাম, জবি প্রতিনিধি:
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী বাহাদুর শাহ পার্ক। একদিকে যেমন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের আড্ডা আর কোলাহল, অন্যদিকে পার্কের এক কোণে ময়লা-আবর্জনার মাঝে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে খেলছিল চার বছরের শিশু পারভিন। যে বয়সে হাতে বই-খাতা কিংবা খেলনা থাকার কথা সেই বয়সে পারভিনের দিন কাটে পার্কের ধুলোবালি কিংবা ফুটপাতে। তবে এই চরম বাস্তবতার মধ্যেও চোখজুড়ে সে শিক্ষিকা হবার স্বপ্ন দেখে।
কথা প্রসঙ্গে যখন তাকে বলা হলো, "চলো, তোমার বাবার কাছে যাই’, মুহূর্তেই বদলে গেল শিশুটির নিষ্পাপ মুখ। আতঙ্কে শিউরে উঠে সে বলল, ‘আব্বার কাছে যামু না, গেলেই মারবে।’
একটি পুরোনো ভাঙা কলম নিয়ে খেলতে খেলতে পারভিন জানায় তার সেই ভয়ের কারণ। তার বাবা তাকে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু সে টাকা না তুলে লুকিয়ে পার্কে খেলা করছে। পারভিনের ভাষায়, "আব্বা আমারে টাকা তুলতে বলছে, আমি না গিয়া লুকাইয়া লুকাইয়া এখানে খেলতাছি।"
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পারভিনের বাবা মুন্না তখন পার্কের ভেতরে ঘুমাচ্ছিলেন। আর মা মোসাম্মৎ নুপুর পাশের রায়সাহেব বাজার এলাকায় তিন বোনকে নিয়ে কলম বিক্রি করছিলেন।
ছোট্ট পারভিন জানায়, প্রতিদিন ‘ভাত খাওয়ার কথা’ বলে মানুষের কাছে হাত পাততে হয় তাকে। বিকেলে বাবা সেই জমানো টাকার হিসাব নেন। চাহিদামতো টাকা তুলতে না পারলে পারভিনসহ তার অন্য বোনদের ওপর নেমে আসে শারীরিক নির্যাতন।
পারভিনের অন্য তিন বোন ফাতেমা, রোজা ও পান্না। এদের মধ্যে দুজন পারভিনের চেয়েও ছোট। চার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মা নুপুর রায়সাহেব বাজার ও সদরঘাট এলাকায় ঘুরে ঘুরে কলম বিক্রি করেন এবং মানুষের কাছে সাহায্যের হাত বাড়ান। শিশুরা ও মায়ের তোলা সব টাকা দিনশেষে জমা হয় বাবা মুন্নার হাতে। পার্কের এক স্থানীয় চা-দোকানির অভিযোগ, স্ত্রী ও সন্তানদের দিনভরের কষ্টের উপার্জনের একটি বড় অংশ মুন্না ব্যয় করেন মাদক সেবনে।
শুধু চরম অভাবই নয়, শারীরিক নানা কষ্টে ভুগছে পারভিন। কিছুদিন ধরে তার মাথা ও ঘাড়ে ফোড়া এবং মুখের ভেতরে ঘা হয়েছে। আক্ষেপ করে শিশুটি বলে, "অনেক দিন ধইরা বাপকে বলতেছি আমার ঘাড়ে ও মাথায় ফোড়া হইছে, ওষুধ কিনে দিতে। দিমু দিমু কইরা আর কিন্না দেয় না।"
সন্ধ্যায় কথা হয় পারভিনের মা মোসাম্মৎ নুপুরের সঙ্গে। স্বামীর নির্মম আচরণের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, "মেয়েরা টাকা আনতে না পারলে ও বকাবকি করে এবং আমাকেও মারধর করে। আমি চাই আমার স্বামী আবার কাজ শুরু করুক, সংসারের দায়িত্ব নিক।"
তবুও থমকে যায়নি স্বপ্ন
পরিবারের এমন করুণ দশা ও জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাও দমাতে পারেনি পারভিনের শিশুমনের স্বপ্নকে। পড়াশোনা করে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা তার। পারভিন বলে, "আমি লেখাপড়া করে অনেক বড় হতে চাই। বড় হয়ে স্যার হতে চাই। সবাইরে পড়াইতে চাই।"
মা নুপুরও চার মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, "মেয়েদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল বানাতে চাই। প্রয়োজনে মানুষের বাসায় কাজ করে হলেও ওদের পড়াব। এভাবে রাস্তায় রাস্তায় থাকতে আর ভালো লাগে না। কিছু টাকা জমাইতে পারলে গ্রামে ফিরে যাবো কিংবা কেউ যদি একটু আর্থিক সহায়তা করত তবে মেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারতাম।"
জানা গেছে, পরিবারটি প্রায় চার বছর ধরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় বাস করছে। তাদের মূল বাড়ি মাদারীপুর জেলায়। পারভিনের বাবা মুন্না জানান, আগে তিনি রিকশা চালাতেন। কিন্তু রিকশাটি চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি বেকার। মুন্না জানান, "কেউ কাজ দিলে আমি করতে চাই। বাধ্য হয়ে বউ-বাচ্চাদের নামিয়েছি। আমিও চাই আমার মেয়েরা লেখা পড়া করুক।"